বাংলাদেশ অনলাইন ডেস্ক : | বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
প্রতীকী ছবি
ভুলতে যাওয়া রোগ হাম এ বছর দেশে তৈরি করেছে উদ্বেগ। রোগীর সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য দেখাচ্ছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম কিংবা হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। এ সময়ে এত রোগী আর কোনো দেশে পাওয়া যায়নি।
বিশ্বজুড়ে হাম ও রুবেলা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তর জেনেভায় নিয়মিত যে প্রাথমিক উপাত্ত জমা হয়, সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে সেই তথ্য সংগ্রহ করে এই চিত্র দেখা গেছে। ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনও (সিডিসি) বিশ্বে হাম সংক্রমণের পরিস্থিতি জানাতে জুলাই মাসে তৈরি করা ডব্লিউএইচওর নজরদারি প্রতিবেদনটি ব্যবহার করেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছয় মাসে হাম সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশের নাম শীর্ষে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। এ সময়ে দেশটিতে হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ২৬ হাজার ৬০৭ জন। যুদ্ধপীড়িত ইয়েমেন ১৪ হাজার ৫২১ রোগী নিয়ে রয়েছে তৃতীয় স্থানে। শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে এরপর রয়েছে মেক্সিকো (১২,৪৯৫), পাকিস্তান (১১,০৩৭), ক্যামেরুন (৯,৬৫৩), কাজাখস্তান (৭,৭৩০), গুয়েতেমালা (৬,৮৩২), অ্যাঙ্গোলা (৬,৮১৫) ও সুদান (৫,৭৬৬)।
ডব্লিউএইচও এই ছয় মাসে বিশ্বের ১৬৫ দেশে ১ লাখ ৮৬ হাজার হাম কিংবা এর উপসর্গের রোগী পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে। পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সবচেয়ে বড় হাম সংকট এখন দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে।
ডব্লিউএইচও জুন মাসে যে নজরদারি প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানে হাম সংক্রমণে ভারত ছিল শীর্ষে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসে দেশটিতে রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২৩ হাজার ৩৬১ জন। ওই সময়ে বাংলাদেশ ১৪ হাজার ৭০৪ রোগী নিয়ে ছিল দ্বিতীয় স্থানে। জুলাই মাসের প্রতিবেদন বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার দিকটি নির্দেশ করছে।
দেশে বছরের শুরুতে হঠাৎই শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কিছুদিনের মধ্যে রোগীর দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১৫ মার্চ থেকে হাম সংক্রমণের তথ্য দিচ্ছে। সেই তথ্য অনুসারে, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে হামের সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জন আর ১৪ হাজার ৭০৮ জনের হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭০২ জনের। এ ছাড়া ৯৫টি শিশু মারা গেছে, যাদের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত ছিল। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ সময়ে মারা গেছে ৭৯৭ শিশু।
ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে গত মার্চে হঠাৎই রোগীর সংখ্যা ৫ হাজারে পৌঁছায়। পরের মাস এপ্রিলে সংখ্যাটি ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। মে মাসে রোগী পাওয়া যায় ১৫ হাজার।
ডব্লিউএইচওর হামের প্রাথমিক তথ্য যে ইঙ্গিত দিচ্ছে, চূড়ান্ত হিসাবেও তার হেরফের হবে না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যে এবার হামের সংক্রমণের শীর্ষে থাকবে, এটা ধরেই নেওয়া যায়। শুধু সংক্রমণের দিক থেকে নয়, বাংলাদেশে সম্ভবত এবার হামে মৃত্যু বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। ডব্লিউএইচওর এ প্রতিবেদনের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ এ বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে উঠে এলেও আগের বছরগুলোয় চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২, ২০২২ সালে ৩১১ জন।
টিকাদানে ঘাটতি, সংক্রমণে ঊর্ধ্বগতি
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এ ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিল। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।
২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কাভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিল। সেবার কাভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
২০২০–২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।
ডব্লিউএইচওর জুলাই মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে এবার আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা বেশি। এক বছরের কম বয়সী যে পাঁচ হাজারের মতো শিশু গত এক বছরে হামে আক্রান্ত হয়েছে, তার চার হাজারের বেশি হামের টিকার দুই ডোজের একটিও পায়নি। এক থেকে চার বছর বয়সী চার হাজার রোগীর মধ্যে দেড় হাজার শিশু টিকার কোনো ডোজ পায়নি, এক ডোজ পেয়েছে ৫০০ জনের মতো। ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী ১ হাজার শিশুর অর্ধেকই টিকার কোনো ডোজ পায়নি।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘টিকা দিতে আমরা উপেক্ষা করেছি, অথচ টিকায় বাংলাদেশের ঐতিহ্য ছিল।’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি। অন্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম।
জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া ৫ মে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে ভ্যাকসিন সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
তখন ইউনিসেফ সম্ভাব্য টিকাসংকট এবং রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সতর্ক করে চিঠি দিলেও অন্তর্বর্তী সরকার তখন এতে মনোযোগ দেয়নি বলে এখন সমালোচনা চলছে।
হার্ড ইউনিমিটি ঝুঁকিতে
হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এ কারণে ডব্লিউএইচও বলছে, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। এ অবস্থাকেই বলা হয় হার্ড ইমিউনিটি। তখন কোনো এলাকায় অল্পসংখ্যক টিকা না পেলেও সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে না।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হার্ড ইমিউনিটি এক দিনে তৈরি হয় না, আবার এক দিনে ভেঙেও পড়ে না। কিন্তু টানা দুই বছর প্রয়োজনীয় কাভারেজ না হলে ধীরে ধীরে ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়। এর ফল হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকে যাবে।
এবার বাংলাদেশে যে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেটিও মূলত এই ইমিউনিটি গ্যাপের ফল বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করেছে।
এবার প্রাদুর্ভাবের পর গত এপ্রিলে বর্তমান বিএনপি সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করে, কিন্তু তাতেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। কারণ, হামের টিকা দিতে এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুর হিসাব করা হয়, কিন্তু গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে আওতায় আনা হয়। বিষয়টি প্রকাশের পর জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেছিলেন, এই ভলিউমের শিশু বাদ পড়া খুবই মারাত্মক। কারণ, তারা শুধু নিজেরাই ঝুঁকিতে নেই, অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলবে।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যত কথা বলেছে, কাজ তত করেনি। সবচেয়ে বড় কথা হলো গণটিকা দেওয়ার পর এত মৃত্যু, এটা সম্ভবত বাংলাদেশে বেশি। ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ ও অন্য অংশীদার সংস্থাগুলো বলছে, কাভারেজের বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনতে না পারলে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটবে না।
Posted ১২:৩০ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh